শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

রাইজেন ৩০০০ প্রসেসর ক্লক-স্পীড বিতর্ক: আপনার যেটা জানা দরকার


AMD-এর Ryzen 3000 (রাইজেন ৩০০০) সিরিজ -এর প্রসেসর গুলি এই মুহূর্তে প্রযুক্তির দুনিয়ায় বিশেষ চর্চার বিষয়। তার যথেষ্ট কারণ ও রয়েছে - একেতো অনেকদিন পিছিয়ে থাকার পর AMD এই 3rd জেনারেশন রাইজেন প্রসেসর কে হাতিয়ার করে Intel এর সাথে সমানে-সমানে লড়ে যাচ্ছে , তার সঙ্গে রয়েছে এদের দারুন "Value  For  Money"! কিন্তু অল্প কিছদিন হলো, বিভিন্ন ফোরাম বা ইউটুবে একটা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, সেটা হলো - Ryzen 3000 সিপিইউ গুলির একটা বড় অংশ নাকি তাদের ম্যাক্সিমাম Boost-Clock (বুস্ট ক্লক) ছুঁতে পারছে না ! এটা কি সত্যি না এর সাথে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু ধন্ধ আর ধোঁয়াশা ? আপনার ই বা কী করণীয় ? চলুন দেখা যাক। 

আগে আমরা দেখে নেবো Boost-Clock কী এবং কিভাবে সে তার কাজ করে। এখন যেকোনো মডার্ন বা আধুনিক মাইক্রোপ্রসেসর -এ দু ধরনের ক্লক-স্পীড বা frequency (ফ্রীকোয়েন্সি) থাকে - ১. Base Clock, ২. Boost Clock.
Base Clock হচ্ছে প্রসেসরের প্রাথমিক বা ভিত্তিমূলক স্পীড - কম্পিউটারের যেকোনো কাজে সে মাইক্রোসফট অফিস হোক বা গেমিং, আপনার প্রসেসর ন্যূনতম এই স্পীডে চলবে। অন্যদিকে Boost Clock হচ্ছে প্রসেসরের Maximum বা সর্বোচ্চ গতি যেটা বিশেষ পরিস্থিতিতে active হয়। এই Boost Clock আবার দু-রকমের - ১. সিঙ্গেল-কোর (Single-Core), ২. মাল্টি-কোর (Multi-Core).  

সিঙ্গেল-কোর বুস্ট কাজ করে যখন আপনি কম্পিউটারে এমন কিছু সফটওয়্যার বা গেম চালাচ্ছেন যার জন্য প্রসেসরের ১টি  বা খুবজোর ২টি কোর যথেষ্ট। মাল্টি-কোর বুস্ট কিন্তূ একটিভ হয় যখন প্রসেসরের সবকটি কোর (বা অধিকাংশ কোর) কাজ করে। আর একটি দরকারি কথা হলো সিঙ্গেল-কোর বুস্ট সবসময়  মাল্টি-কোর বুস্ট এর থেকে বেশি হবে। 

এবার দেখে নিই Ryzen 3000 প্রসেসর আর তাদের বিশদ বিবরন:
CPU
Core/Thread
Base Clock (GHz)

Boost Clock (GHz)
L3 Cache
(MB)
TDP
(Watt)
Ryzen 9 3900X
12C/24T
3.8
4.6
64
105
Ryzen 7 3800X
8C/16T
3.9
4.5
32
105
Ryzen 7 3700X
8C/16T
3.6
4.4
32
65
Ryzen 5 3600X
6C/12T
3.8
4.4
32
95
Ryzen 5 3600
6C/12T
3.6
4.2
32
65
 

দেখতেই পাচ্ছেন যে প্রতিটি Ryzen 3000 প্রসেসর তাদের Base Clock এর অনেকটা উপরে boost করতে পারে যেটা দারুন ব্যাপার কারণ Boost Clock যত বেশি হবে ততই আপনার কম্পিউটার ফাস্ট আর রেস্পন্সিভ হবে।  গেমিং এর ক্ষেত্রেও সিঙ্গেল-কোর বুস্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ !

( পাঠকদের মধ্যে যারা একটু বেশি উৎসাহী তাদের জন্য বলে রাখি, AMD আর Intel  -এই দুটি কোম্পানির প্রসেসরেই বুস্ট-ক্লক থাকে, কিন্তু আলাদা নামে তাদের ডাকা হয়। Intel এর বুস্ট এর নাম টার্বো-বুস্ট (Turbo Boost) আর AMD -এর ক্ষেত্রে এর নাম প্রেসিশন বুস্ট (Precision Boost). প্রেসিশন বুস্ট এখন তার ২.০ ভার্সন এ রয়েছে এবং এটি একটি খুব ডাইনামিক আর সুযোগসন্ধানী মেকানিজম। )

কিন্তু এখানে একটা লাখ টাকার প্রশ্ন লুকিয়ে আছে ! সেটা হচ্ছে আদৌ আপনার ঝকঝকে নতুন Ryzen 3000 প্রসেসরটি তার রেটেড ম্যাক্স-ক্লক স্পীড পর্যন্ত বুস্ট করবে কি না ! যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন আমি বলবো নিশ্চই করবে তবে তার জন্য আপনাকে কয়েকটি জিনিস একটু জেনে রাখতে হবে। সেগুলি নিচে পয়েন্ট করে দিলাম :-

১. প্রথমেই বলেছি যে রাইজেনের বুস্ট-ক্লক বা প্রেসিশন বুস্ট কখন বা কতটা একটিভ হবে সেটা অনেকটাই কি সফটওয়্যার চলছে তার উপর নির্ভর করে। যদি ওয়ার্কলোড হালকা বা লাইটলি-থ্রেডেড (১/২ কোর) হয় যেমন Mp3 এনকোডিং, নেট সার্ফিং, হালকা গেমিং বা মাইক্রোসফট অফিস তখন বুস্ট ফ্রিকোয়েন্সি অনেক বেশি হবে।  কিন্তু কোনো মাল্টি-থ্রেডেড (৪ এর বেশি কোর) সফটওয়্যার যখন চলবে, যেমন - ভিডিও এডিটিং/ট্রান্সকোডিং, 3-D রেন্ডারিং বা গেম-স্ট্রিমিং তখন কিন্তু বুস্ট ফ্রিকোয়েন্সি অনেকতাই কম হবে।

২. কুলিং যত ভালো হবে প্রসেসর কোর তত উঁচু ফ্রিকোয়েন্সি ছুতে পারবে  -এটা PC হার্ডওয়্যার এর প্রমাণিত নিয়ম। এই নিয়ম বুস্ট-ক্লক এর উপরেও প্রযোজ্য। সিপিইউ যত দামি আর হাইএন্ড হবে তার তাপমাত্রাও কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়বে, সুতরাং আপনাকেও ঠিক ততটাই উঁচুমানের ফ্যান এবং হিটসিংক ব্যবহার করতে হবে।  না হলে প্রসেসর থ্রটল করবে মানে তার ক্লক-স্পীড কমে যাবে যাতে কম্পিউটারের পারফরমেন্স আর স্টেবিলিটি দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে! তবে চিন্তার কিছু নেই, AMDর Wraith (রেইথ) সিপিইউ কুলার যা রাইজেনের সঙ্গে ফ্রী পাওয়া যায়, সেটি ভালো ও সক্ষম কুলার এবং এন্ট্রি-লেভেল বা মিডরেঞ্জ রাইজেনের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু Ryzen 9 3900X (১২ কোর/২৪ থ্রেড) এর মতো হাইএন্ড মডেল ব্যবহার করলে অথবা ওভারক্লকিং (Overclocking) এর চিন্তাভাবনা থাকলে আমি বলবো লিকুইড কুলারে ইনভেস্ট করতে। আমাদের যেরকম গরমের দেশ, তাতে সিং নয়, "Cooling is King"!! 

৩. নিয়মিত ও দীর্ঘস্থায়ী বুস্ট -ফ্রিকোয়েন্সি ধরে রাখতে মাদারবোর্ড (Motherboard) এর ভূমিকাও ফেলনা নয়।  নতুন প্রজন্মের রাইজেন সিপিইউ এর থেকে সেরা পারফরমেন্স বের করে নিতে গেলে এমন মাদারবোর্ড দিতে হবে যার ভালো VRM বা Voltage Regulator Module (ভোল্টেজ রেগুলেটর মডিউল) সেট-আপ (বিন্যাস) আছে। এতে করে মাদারবোর্ড প্রসেসরকে  সঠিক পরিমানে ভোল্টেজ বা কারেন্ট এর সরবরাহ করতে পারবে।  আর যেটা জিনিস দেখে নেওয়া দরকার তা হলো VRM / MOSFET (মসফেট) এরিয়াতে যেন ভালো কোয়ালিটির হিটসিংক থাকে। 

৪. মাদারবোর্ড - তা সে যে Chipset (চিপসেট) এর হোক না কেন, BIOS (বায়োস) যেন লেটেস্ট থাকে। রাইজেন 3000 যথেষ্ট নতুন প্লাটফর্ম, এর BIOS এর এখন অনেক অদলবদল হবে, অনেক আপডেট আসবে। একটা প্যাচ বা ফিক্স প্রসেসরের পারফরমেন্স অনেক পরিবর্তন আনতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি, রাইজেন এর শেষ যে BIOS আপডেট বেরিয়েছিল তাতে AMD বুস্ট-ক্লকের আচরণে কিছু পরিবর্তন করে, ফলস্বরূপ কিছু ক্ষেত্রে প্রসেসর তার ক্যাপাসিটির পুরোটা ব্যবহার করছিলো না। আশার কথা, AMD রাইজেনের পরবর্তী আপডেটে সেটা ফিক্স করতে চলেছে। এই আপডেটেড BIOS মাদারবোর্ড কোম্পানির ওয়েবসাইটে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসে যাবে। 

৫. কম্পিউটারে যেন অবশ্যই Windows 10 এবং চিপসেট ড্রাইভার এর লেটেস্ট ভার্সন ইনস্টল করা থাকে। Windows 10 এর লেটেস্ট ভার্সনে রাইজেনের জন্য কিছু বিশেষ আপডেট আছে যা এই প্রসেসর গুলিকে তাদের পূর্ণশক্তিতে চলতে সাহায্য করবে এবং পাওয়ার কনসাম্পশন ও টেম্পারেচার নিয়ন্ত্রণ করবে।  

এরপরেও কিছু ব্যাপার থেকে যায় যেমন সিপিইউ এর সিলিকন এর কোয়ালিটি বা বিভিন্ন BIOS সেটিং যেগুলি প্রসেসরের বুস্ট-ক্লক কে প্রভাবিত করতে পারে। যদি সেসব সম্পর্কে জানতে চান তাহলে পরবর্তী লেখায় যথাসাধ্য প্রচেষ্টা করবো। Ryzen 3000 সিরিজের প্রসেসর নিয়ে যা শোনা যাচ্ছে তার একটা বড় অংশ উঠে আসছে উপরোক্ত বিষয় গুলি সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণার জন্য বা এই প্রসেসর গুলির বিভিন্ন কার্য-প্রক্রীয়া নিয়ে  বিস্তারিত আইডিয়া না থাকার জন্য। আশা করবো এই লেখা কিছু সেরকম কনফিউসন দূর করতে সহজ করবে।

**এই লেখাটি আমার একটি ইংরেজি আর্টিক্যালের সংক্ষেপিত অনুলিখন, অরিজিনাল আর্টিক্যালটিতে আলোচ্য বিষয়টির অনেক বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। টেক-উৎসাহীদের জন্য অরিজিনাল এখানে আর্টিক্যালটির লিংক দিলাম। যেকোনো মন্তব্য ও উপদেশ স্বাগত!